বিতর্কিত এক ঘটনার জেরে মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়াতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনকে। আজ সোমবার সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, আজ বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন।

আজ সকালের ওই পোস্টে ইশরাক হোসেন লেখেন, “ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।”

Adsterra Native Banner / In-Article Ad Slot

তিনি আরও যোগ করেন, “এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশা আল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব। মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!”

গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযানের সূত্রপাত

এর আগে গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় আকস্মিক মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে তিনি সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তাঁর পাশ থেকে একজনকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলেও বলতে শোনা যায়। সে সময় তাঁর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষী ও সহযোগীরা কয়েকজনকে ধরে ফেলেন এবং এক তরুণকে লাথি মারেন।

পরে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। ভিডিওটিতে প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীসহ অন্যদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। ভিডিওর কিছু অংশে প্রতিমন্ত্রীর পিস্তল অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে তা স্পষ্ট ছিল। তবে গুলি করার হুমকি দেওয়া ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও অস্বস্তি তৈরি হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য বহন করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তির সৃষ্টি হয়—এমনভাবে তা প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তদন্ত শুরু করেছে। ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের ডিসিকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, সমালোচনার মুখে নিজের ভেরিফায়েড পেজে বিবৃতি দিয়ে ইশরাক দাবি করেন, পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তেই তিনি ওই মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তাঝুঁকি ও অতর্কিত হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার্থেই তিনি লাইসেন্সকৃত অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা ও পদত্যাগের নির্দেশ

সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, এই ঘটনার পর দলের ভেতরে ও বাইরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হলে গতকাল রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানেই তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

আগেও পদ হারিয়েছেন এক সংসদ সদস্য

ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার মাত্র আড়াই সপ্তাহ আগে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দলের আরেক নেত্রীকেও পদ ছাড়তে হয়েছিল। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নাম আসে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ লোকজনদের। যদিও তিনি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন, তবুও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।

ঠিক একই কায়দায় দলীয় শৃঙ্খলা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জ এবার প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকেও মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হলো। পদ ছাড়ার পর এবার মাঠপর্যায়ে কর্মী হিসেবে মাদক নির্মূল এবং অঙ্গসংগঠন ‘প্রজন্ম দল’-এর শক্তি বাড়াতে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।